গাজায় রেফ্রিজারেটর নেই, নেই বিদ্যুৎ! চলছে প্রতিদিন খাবার বাঁচানোর অসম লড়াই।
গাজায় এখন একটি টুকরো বরফ, এক গ্লাস ঠান্ডা পানি কিংবা একটুখানি সংরক্ষিত দুধ, এসবই বিলাসিতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, আর জ্বালানির তীব্র সংকটে লাখো পরিবার রেফ্রিজারেটর চালানো তো দূরের কথা, একবেলার রান্না করা খাবারও পরের বেলা পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পারছে না।
তীব্র গরমে মাংস, দুধ, সবজি সবকিছুই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে, আর তার সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (OCHA)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, গাজার কমিউনিটি কিচেনগুলোতে সীমিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও রেফ্রিজারেশন যন্ত্রপাতির অভাবে পচনশীল খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
এমনকি গাজায় ঢোকা প্রায় দেড় হাজার মেট্রিক টন খাদ্যপণ্য ইতিমধ্যে পচে যাওয়ায় তা আলাদা গুদামে সরিয়ে রাখতে হয়েছে, যাতে অন্য খাবারে দূষণ না ছড়ায়।
একই চিত্র উঠে এসেছে জাতিসংঘের আরেকটি প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, গাজায় প্রতিদিন প্রায় ১৮১টি কমিউনিটি কিচেন থেকে ১৭ লাখেরও বেশি খাবার বিতরণ করা হলেও, বিদ্যুতের অভাবে যথাযথ রেফ্রিজারেশন না থাকায় পচনশীল খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
ঘরে ঘরে টিকে থাকার নতুন কৌশল
আল জাজিরার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গাজার সাধারণ মানুষের নিদারুণ বাস্তবতা। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বহু আগেই সতর্ক করেছিল যে তীব্র গরম, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং রেফ্রিজারেশনের অভাব খাদ্য নষ্ট হওয়া ও খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে, বিশেষত বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর মধ্যে।
গাজা সিটির এক তাঁবুতে বসবাসকারী চার সন্তানের মা মালাক আল-জা’নিনের গল্পই যেন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি।
একবার মাংস ঠান্ডা রাখতে তিনি ৩ ডলার খরচ করেছিলেন এক ব্যবসায়ীকে দিয়ে, কিন্তু পরে দেখেন সেই মাংসও পচে গেছে। প্রতিদিন তাঁকে ছায়ার এক কোণ থেকে আরেক কোণে সবজি সরিয়ে সরিয়ে রাখতে হয়, শুধু পচন কিছুটা দেরি করানোর আশায়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় নিজের সন্তানদের একটুখানি ঠান্ডা ফল বা জুসও দিতে পারেন না তিনি; বদলে একটা বালতিতে পানি ভরে রাখেন, যাতে গরমে অন্তত শরীরটা একটু জুড়াতে পারে।
গাজা সিটির জেইতুন এলাকার বাসিন্দা নিদাল রফিহর গল্পটাও মর্মস্পর্শী।
যুদ্ধে অচল হয়ে পড়া তাঁর রেফ্রিজারেটরটি এখন আর ঠান্ডা রাখার যন্ত্র নয় বরং টিনজাত খাবার আর টুকিটাকি জিনিস রাখার এক আলমারি মাত্র। তার ভাষায়,
“যেসব জিনিস একসময় জীবনের অত্যাবশ্যকীয় অংশ ছিল, এখন সেগুলোর জন্যই বাড়তি টাকা গুনতে হয়”।
এই সংকটকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক নতুন ‘অর্থনীতি’।
মধ্য গাজা সিটির এক শিবিরে মোহাম্মদ আল-জা’নিন নামের একজন চালাচ্ছেন ফ্রিজার-সেবা ব্যবসা—পানির বোতল, পানীয় আর খাবার ঠান্ডা রাখার বিনিময়ে টাকা নেন তিনি। কিন্তু চাহিদা এত বেশি যে তিনি সবাইকে সেবা দিতেই পারেন না।
শুধু একটি ফ্রিজার চালাতেই মাসে প্রায় ৪৮৮ ডলার খরচ হয়, আর প্রতি দশ দিনে বিদ্যুৎ বিল আসে ৪২৩ থেকে ৪৫৬ ডলারের মতো—প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের দাম পড়ে প্রায় ১১ ডলার। এত চড়া মূল্য সত্ত্বেও গ্রাহকের অভাব নেই তাঁর।
ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী সংকট
আল জাজিরার আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেইর এল-বালাহর বাসিন্দা আব্দেল করিম সালমান বলেন, তাঁর ঘরে এখন না আছে রেফ্রিজারেটর, না ওয়াশিং মেশিন—এমনকি শিশুখাদ্যও দুই-তিন ঘণ্টার বেশি সংরক্ষণ করা যায় না।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধারাবাহিকভাবে ভেঙে পড়েছে জ্বালানি সংকট আর অবকাঠামোগত ধ্বংসের কারণে।
২০২৫-২৬ সালের মধ্যে গাজার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে বর্ণনা করা হচ্ছে—যেখানে বিদ্যুৎ প্রাপ্তি খণ্ডিত, অনিয়মিত এবং মূলত জরুরি বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
খাদ্য নিরাপত্তার এই সংকট শুধু গৃহস্থালি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়—দোকান আর গুদামগুলোতেও একই দুর্দশা। মুরগি ও অন্যান্য মাংসজাত পণ্য সংরক্ষণকারী দোকানগুলোও বিদ্যুৎ সংকট এবং সোলার পাওয়ার ও ডিজেলের চড়া মূল্যের কারণে হিমশিম খাচ্ছে।
একটি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা
এই সংকট শুধু গাজার একার সমস্যা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহের বিপদেরই এক চরম রূপ।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপেও রেকর্ড তাপপ্রবাহে রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে শুধু জুন মাসেই ইউরোপে দশ হাজারেরও বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে।
পার্থক্য শুধু এটুকুই—উন্নত বিশ্বে এটি একটি অস্বস্তির বিষয়, আর গাজায় এটি জীবন মৃত্যুর প্রশ্ন।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদন বারবার সতর্ক করছে, রেফ্রিজারেশনের অভাব শুধু খাদ্য অপচয়ের বিষয় নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর আঘাত।
ডায়রিয়া, বমি ও অন্যান্য খাদ্যবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়েছে অপুষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে।
গাজার মানুষের এই লড়াই শুধু “খাবার জোগাড়ের” লড়াই নয়—এটি খাবারকে বাঁচিয়ে রাখার, তাকে নষ্ট হতে না দেওয়ার এক নিরন্তর সংগ্রাম।
যেখানে একটি রেফ্রিজারেটর শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং জীবনের ন্যূনতম মর্যাদা টিকিয়ে রাখার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
–
Desk- The Compass
